
একটি হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের পরিবার শুধু একজন মানুষকে হারায় না; তারা হারায় নিরাপত্তাবোধ, স্বাভাবিক জীবন এবং অনেক সময় বছরের পর বছর মানসিক শান্তিও। মামলা হয়, তদন্ত হয়, সাক্ষ্যগ্রহণ হয়, জামিন হয়—কিন্তু বিচার শেষ হতে হতে কখনো এত সময় পেরিয়ে যায় যে বিচারের অপেক্ষাটাই পরিবারের জন্য আরেক ধরনের শাস্তিতে পরিণত হয়।
সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ড আমাদের বিচারব্যবস্থার গতি ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। কুমিল্লায় ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম হত্যার ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
এর আগে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ১১ বছরের আফরিন আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় সিসিটিভি ফুটেজ তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে।
২০২২ সালে চট্টগ্রামে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রায় ৩০০টি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করে।
আবার ২০১৭ সালে চট্টগ্রামে নয় বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামিকে ২০২৩ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত।
সর্বশেষ কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের হত্যাকাণ্ড আমাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ৮ অক্টোবর ধানখেতের পাশ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন এ ঘটনায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় পুলিশ। ১০ অক্টোবর পুলিশ জানায়, প্রাথমিক তদন্তে তাজমিনকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় তাঁর সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। নিহতের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।
তাজমিনের মর্মান্তিক পরিণতি শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি জননিরাপত্তা, অপরাধ প্রতিরোধ এবং বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়। তদন্তে দ্রুত অগ্রগতি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করাই শেষ কথা নয়। তদন্তের প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং ন্যায়সংগত বিচার সম্পন্ন করাই হচ্ছে পরবর্তী বড় পরীক্ষা।
এসব ঘটনা একটি বিষয় স্পষ্ট করে—প্রযুক্তি এখন অপরাধের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য, অবস্থানসংক্রান্ত উপাত্ত, কল রেকর্ড এবং ফরেনসিক বিশ্লেষণ অপরাধের সূত্র উদ্ঘাটনে সহায়ক হতে পারে। তাহলে শক্তিশালী প্রমাণ থাকা মামলাগুলোর বিচারপ্রক্রিয়া অপ্রয়োজনীয়ভাবে বছরের পর বছর চলবে কেন?
আমার প্রস্তাব হলো, গুরুতর হত্যামামলার শুরুতেই একটি বিচারিক স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। মামলার প্রাথমিক পর্যায়ে CCTV, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ফরেনসিক রিপোর্ট, মোবাইল রেকর্ড ও অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য পর্যালোচনা করে মামলার প্রাথমিক ভিত্তি নির্ধারণ করা হবে।
যেসব মামলায় শক্তিশালী প্রাথমিক প্রমাণ থাকবে, সেগুলো নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর আওতায় বিশেষ ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত বা বিশেষ বেঞ্চে পাঠানো যেতে পারে। তদন্ত, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্ক ও রায়ের জন্য বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
দ্রুত বিচার অবশ্যই তাড়াহুড়োর বিচার নয়। অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থন, আইনজীবীর সহায়তা, সাক্ষীকে জেরা এবং আপিলের অধিকার অক্ষুণ্ন রেখেই অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব কমাতে হবে।
প্রযুক্তিগত প্রমাণের ক্ষেত্রেও আমাদের আইন এখন অনেকটাই আধুনিক। Evidence Act-এর ৩ ধারায় CCTV ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্যকে ডিজিটাল রেকর্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ৬৫A ও ৬৫B ধারায় ডিজিটাল রেকর্ডের গ্রহণযোগ্যতার বিধান রয়েছে এবং ৪৫ ধারায় ডিজিটাল ও ফরেনসিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞের মতামতকে প্রাসঙ্গিক প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জামিন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারায় মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবনযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে জামিনের বিষয়ে বিশেষ বিধান রয়েছে। ৪৯৮(২) ধারায় জামিনের সঙ্গে পলাতক হওয়া ঠেকানো বা ভালো আচরণ নিশ্চিত করার জন্য যুক্তিসঙ্গত শর্ত আরোপের সুযোগ রয়েছে।
এখানে লক্ষ্য জামিনের অধিকার বাতিল করা নয়; বরং গুরুতর মামলায় বিদ্যমান আইনি মানদণ্ড যথাযথভাবে প্রয়োগ করা। অভিযোগকারী বা সাক্ষীকে ভয় দেখানো, প্রভাবিত করা কিংবা পলাতক হওয়ার বাস্তব ঝুঁকি থাকলে সেসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অত্যন্ত গুরুতর ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলার বিচারও আইন ও ন্যায়বিচারের সীমার মধ্যে যতটা সম্ভব স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান করা যেতে পারে। এর উদ্দেশ্য জনসমক্ষে শাস্তি দেওয়া নয়; বরং মানুষকে দেখানো—গুরুতর অপরাধের বিচার হয় এবং তা অনির্দিষ্টকাল ঝুলে থাকে না।
হত্যামামলার বিচার দ্রুত করতে তাই প্রয়োজন বিচারিক স্ক্রিনিং, বিশেষায়িত দ্রুত বিচারব্যবস্থা, ডিজিটাল প্রমাণের কার্যকর ব্যবহার, জামিনের বিধানের যথাযথ প্রয়োগ এবং সাক্ষী ও অভিযোগকারীর নিরাপত্তা।
বিচার দ্রুত হতে হবে, কিন্তু তাড়াহুড়ো করে নয়। প্রমাণভিত্তিক হতে হবে, কিন্তু ন্যায়বিচারের মূলনীতি বাদ দিয়ে নয়। নিহতের পরিবার যেমন বিচার পাওয়ার অধিকার রাখে, তেমনি অভিযুক্তেরও ন্যায্য বিচারের অধিকার রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রমাণ যখন শক্তিশালী, তখন বিচারও হবে দ্রুত; আর বিচার যখন হবে, তা হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আইনের পূর্ণ সুরক্ষার মধ্য দিয়ে।
লেখকঃ-
মোঃ মিজানুর রহমান
শাখা প্রধান
রূপালী ব্যাংক পিএলসি
পিরোজপুর কর্পোরেট শাখা
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ উর্মিলা আক্তার শান্তা
ঠিকানাঃ মাতুয়াইল, যাত্রাবাড়ি, ঢাকা ১৩৬২
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক বাংলা সংবাদ ২০২৬